আওয়ামী লীগের গোলাম হোসেনদের কী হবে?

0
307

শ্রী শচীন্দ্রনাথ সেনের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকটি যাঁরা দেখেছেন বা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, সেই নাটকে গোলাম হোসেন নামে একটি অদ্ভুত চরিত্র আছে। তিনি নবাবের খাস গোলাম। নবাবকে সুপরামর্শ দিতেন। শত্রুদের সম্পর্কে সজাগ করে দিতেন। কিন্তু নবাব ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে মীর জাফর আলী খান, উমি চাঁদ, রাজবল্লভ প্রমুখের প্রতি নির্ভরশীল। ফলে তিনি তাঁদের পরামর্শ ফেলে দিতে পারতেন না। শেষ পর্যন্ত পলাশীর যুদ্ধে নবাব পরাজিত হন এবং মোহাম্মদী বেগের হাতে জীবন দিতে হয়।

হাল আমলের গোলাম হোসেন ও তাঁর প্রতিপক্ষ দুজনই আওয়ামী লীগের নেতা। তিনিও তাঁর প্রতিপক্ষের মতো সরকারি কর্মকর্তা থেকে রাজনীতি হয়েছেন। তবে তাঁর প্রতিপক্ষ যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন হয়তো গোলাম হোসেন উপসচিবের মর্যাদার কোনো নবীন কর্মকর্তা। তারপরও গোলাম হোসেন লড়াইয়ের মাঠ ছাড়েননি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক এই চেয়ারম্যান গত বছর ২৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগে যোগদান করে সাধারণ সদস্য পদ গ্রহণ করেন। জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলালসহ অন্য নেতারা ছাড়াও তাঁর এলাকা কচুয়া উপজেলার নেতা-কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। ইতিমধ্যে তিনি চাঁদপুর-১ নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে গণসংযোগও করছেন। বর্তমানে এ এলাকার এমপি সরকারদলীয় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর।

গতকাল রোববার চাঁদপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় যোগদানের পথে কচুয়া উপজেলার আশ্রাফপুর কাঁঠালবাগান, রাজাপুর সকিনার দালান ও রাজাপুর তুলাগাছতলা এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার দিকে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান চাঁদপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আলহাজ মো. গোলাম হোসেনের নেতা-কর্মীদের গাড়িবহরে হামলা হয়। এতে অন্তত ২০ নেতা-কর্মী আহত ও ১০টি গাড়ি ভাঙচুর ও কয়েকটি গাড়ি আটক রাখার অভিযোগ করেছেন গোলাম হোসেন। আহত নেতা-কর্মীদের মধ্যে কয়েকজনকে হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কচুয়ার হাসিমপুরের ফয়েজুন নেছা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

চাঁদপুর জেলা পরিষদের সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মো. জোবায়ের হোসেনের দাবি, সকাল সাড়ে নয়টায় সময় আলহাজ মো. গোলাম হোসেনের নেতৃত্বে চাঁদপুরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় যাওয়ার সময় পথিমধ্যে কাঁঠালবাগান, সকিনার দালান ও রাজাপুর এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের প্রতিপক্ষ নেতা-কর্মীরা গাড়িবহরে হামলা, ভাঙচুর ও নেতা-কর্মীদের মারধর করেন। কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

গত শুক্রবার রাতে চাঁদপুরে এক সংবাদ সম্মেলন করে গোলাম হোসেন বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ করে এখন আমি আওয়ামী লীগের হাতেই নিরাপদ নই। আমি এবং আমার লোকজন আমার প্রতিপক্ষ চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও তাঁর লোকজনের বিভিন্ন হামলা ও ষড়যন্ত্রের শিকার। গত এক বছরে তাঁদের একাধিক হামলায় আমার ৩০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আমার লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে কচুয়া থানায় অন্তত ১০টি মিথ্যা মামলা করা হয়।’

আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী গোলাম হোসেন বলেন, নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে বারবার বাধা ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। বলেন, ‘আমি কচুয়া থেকে পাঁচ হাজার লোক নিয়ে চাঁদপুর স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় যোগ দেব বলে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টির পাঁয়তারা শুরু করেছে। আমাকে কচুয়া থেকে কোনো বাস, গাড়ি, সিএনজি, এমনকি রিকশা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে আমি পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা ও লাকসাম থেকে ১৩০টি বাস ও ৩০টি পিকআপ ভাড়া করেছি।’

আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপি নেতাদের আন্দোলন বাদ দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়াও সব ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়।

তবে আওয়ামী লীগে গোলাম হোসেনেরা যে কেবল চাঁদপুরেই আছেন, তা-ই নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিভক্ত। এক পক্ষ অপর পক্ষের ওপর চড়াও হয়, মারামারি করে।

সম্প্রতি কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনে নানা অনিয়ম সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। অনেকগুলো ইউনিয়নে বিএনপি জিতেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও স্বীকার করেছেন, দু-একটি জায়গা ছাড়া যেসব ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় বিএনপি জিতেছে, তার বেশির ভাগেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেই বিএনপি জিতেছে। তিনি বলেছেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাঁরা নির্বাচন করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটেছিল। অনেক জায়গায় ভুল প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ফলে, বিএনপি-মনোনীত কিংবা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হন। কিন্তু কাউকে বহিষ্কার করা হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কীভাবে প্রার্থী মনোনয়নের কাজটি করা হবে? আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ঘোষণা দিয়েছে, প্রতিটি আসনে তাদের তিনজন করে সম্ভাব্য প্রার্থী আছেন। এই তিনজন থেকে একজনকে বেছে নেওয়া হবে। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী তৃণমূল থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি প্যানেল কেন্দ্রে পাঠানো হবে। কেন্দ্র সেই তালিকা থেকে একজনকে বেছে নেবে। তৃণমূলে ভোটের মাধ্যমেই প্রার্থীর তালিকা তৈরি করবে।

সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের আট মাস আগে থেকে সম্ভাব্য প্রার্থিতা কিংবা নৌকায় ভোট চাওয়া নিয়ে এই যুদ্ধ কেন? বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগে যাঁরা প্রতিপক্ষের হাতে মার খাচ্ছেন, যাঁরা সভা-মিছিল করতে পারছেন না, তাঁদের কী হবে? তাঁরা যদি দলের মনোনয়ন পান, তাহলেও কি বিএনপির মতো ‘ঘরোয়া বৈঠক’ করে নির্বাচনী প্রচার চালাবেন? আর যদি না পান, তাহলে কি যার হাতে মার খাচ্ছেন, ভোটারদের অনুরোধ জানাবেন তাঁকেই ভোট দিতে?
আওয়ামী লীগের গোলাম হোসেনদের কী হবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here