আলপনার আলোয়

0
485

গত ২৫ মার্চ বেলা তিনটা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ঠিক পাশের রাস্তায় শুরু হয় আলপনা আঁকার মহাযজ্ঞ। কেন এই আয়োজন? প্রশ্নের উত্তর দিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক, অধ্যাপক বশির আহমেদ, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা যে পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল, সে কথা আমরা জানি। ২৬ মার্চও আমাদের জন্য একটা বিশেষ দিন। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এই দুই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার স্মরণ ও সম্মানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র চার দিনব্যাপী মুক্তিসংগ্রাম সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করেছে। সেই উৎসবেরই অংশ হিসেবে আঁকা হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় আলপনা। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে এই দুটি দিনের মাহাত্ম্য তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য।’

উদ্দেশ্য যে বিফলে যায়নি, সেটা বোঝা গেল পুরো আয়োজন ঘুরে। বার্জারের পৃষ্ঠপোষকতায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহযোগিতায় আলপনা আঁকার কাজ শুরু হলেও একসময় এতে অংশ নেয় আরও অনেকে। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, দুই কিলোমিটার জায়গাজুড়ে আলপনা আঁকা হবে। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের তুমুল আগ্রহের কারণে শেষ পর্যন্ত আলপনার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ২.৮ কিলোমিটার।

রেকর্ড সৃষ্টিকারী আলপনা আঁকার আয়োজনে শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, আরও অনেকেই অংশ নিয়েছেন। আলপনা আঁকতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ছুটে এসেছিলেন একদল উৎসাহী শিক্ষার্থী। এত দূর থেকে আসার কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, ‘আসলে এর আগে দেশের সবচেয়ে বড় আলপনাটা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১.৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেই আলপনা আমরাই করেছিলাম। পরে যখন শুনলাম আমাদের রেকর্ড ভাঙা হচ্ছে জাহাঙ্গীরনগরে, তখন আরেকবার নতুন রেকর্ডের অংশ হওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। তা ছাড়া যেহেতু এখানে আলপনা আঁকার পেছনে একটি বিশেষ এবং মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে, সেহেতু এটাও এখানে আসার বড় কারণ।’

রোববার দুপুরে শুরু হয়ে টানা সোমবার দুপুর পর্যন্ত চলেছে মহাযজ্ঞ। প্রায় সব রকম মানুষের অংশগ্রহণই ছিল এই আলপনা আঁকার উৎসবে। চারুকলার দুঁদে আঁকিয়েরা যেমন ছিলেন, তেমনি স্কুলজীবনে আঁকাআঁকিতে গোল্লা পাওয়া ছাত্রটিও হাসিমুখে রঙের ব্রাশ হাতে হাজির হয়েছেন। পিচঢালা রাস্তা রাঙাতে গিয়ে নিজের পোশাকেও রং ছড়িয়েছে, তাতে হাসির দৈর্ঘ্য কমেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনে থেকে উপাচার্যের বাসভবন, আর প্রধান ফটক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সবটুকু রাস্তা ছিল এই আলপনার ক্যানভাস। তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে আলপনা আঁকতে এসেছিলেন এক নারী। তিনি বললেন, ‘যখন শুনলাম একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এত বড় আলপনা আঁকা হচ্ছে, ছেলেকে নিয়ে চলে এলাম। বড় ভাইয়া আপুদের কাছ থেকেই ছেলে হয়তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনবে, ছবি আঁকবে, এই আশায়।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের দীর্ঘতম এই আলপনার খবর পেয়ে এখন অনেকেই আলপনা দেখতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় করছেন। কদিন আগে ঘুরে গেছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমও। আলপনা আঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনি ছবি তুলেছেন। ক্যাপশনে ‘মুশি’ লিখেছেন, ‘অনেক দিন পর প্রিয় ক্যাম্পাসে দারুণ কিছু সময় কাটল।’ দেখে বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তরা তো বটেই, অন্তত জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা ‘লাভ রিঅ্যাক্ট’ দিতে ভোলেননি। আয়োজকেরা বলছেন, আলপনার রং যদি নতুন প্রজন্মের মনে দেশাত্ম্যবোধের রং ছড়িয়ে দেয়, তবেই পেছনের মানুষগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here