শুভ নববর্ষ

0
168

আজ পয়লা বৈশাখ। জীর্ণ-পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে আনন্দ ও নতুন আশার বার্তা নিয়ে বাংলার ঘরে ঘরে আবার এল নববর্ষ। ১৪২৫ বঙ্গাব্দের এই প্রথম প্রভাতে আমরা সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

নববর্ষ এক আনন্দোৎসব। কেননা, তা আসে নতুন আশা নিয়ে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে, নতুন প্রত্যয় নিয়ে। সব অশুভ ও অসুন্দরকে পেছনে ফেলে বৈশাখ আসে নতুনের কেতন উড়িয়ে।

পয়লা বৈশাখের উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর সর্বজনীনতা, এটি সব বাঙালির প্রাণের উৎসব। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষ একান্তই সাংস্কৃতিক ও বৈষয়িক। এর সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। এ উৎসবের প্রচলন ঘটে কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। পরে ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানোর বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত হয়, হালখাতা খোলা হয় পয়লা বৈশাখেই। আদিতে এটি ছিল গ্রামীণ উৎসব, তখন গ্রামে গ্রামে মেলা বসত, নানা রকমের খেলাধুলার আয়োজন হতো। পয়লা বৈশাখের দিন শুরু হওয়া কোনো কোনো মেলা পরবর্তী সপ্তাহ দুয়েক ধরে চলত। এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব মেলা বসে।

কিন্তু পয়লা বৈশাখের উৎসব শুধু গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, শহরাঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছে। এখন শহুরে মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব পয়লা বৈশাখ। গ্রাম-শহর মিলিয়ে পয়লা বৈশাখ এখন সব বাঙালির সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সম্প্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। এর মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয় বাঙালির স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়। পরাধীনতার কালে এই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য আমাদের রাজনৈতিক চেতনাকে শাণিত করেছিল। তাই তো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ উৎসব আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত। আমরা সেই সব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, সেই সংগ্রামের একটা অংশ ছিল ষাটের দশকে ঢাকায় রমনা বটমূলে সূচিত ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব। সেই উৎসব আমাদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করেছে।

রমনা বটমূলের সেই বর্ষবরণ উৎসব আজও অব্যাহত আছে। শুধু তাই নয়, এ অনুষ্ঠানের আদলে রাজধানীর বিভিন্ন মহল্লায় এবং সারা দেশের বিভিন্ন শহরে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন চলে। পয়লা বৈশাখে সারা বাংলাদেশ উৎসবে মেতে ওঠে, সর্বত্র জেগে ওঠে প্রাণের উচ্ছ্বাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার অজস্র মানুষ।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা ও নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। পয়লা বৈশাখের উৎসবের বিরুদ্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো যুক্তিহীন অপপ্রচারও চালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়াসে গত দুই বছর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে উৎসব পালনের সময়সীমা কমিয়ে দিয়েছিল, এবারও একই ধরনের পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। কিন্তু প্রশাসনের ভেবে দেখা উচিত, এ রকম কঠোরতার প্রয়োজন আসলেই আছে কি না। গত দুবার প্রশ্ন উঠেছিল, বিকেল পাঁচটার মধ্যে সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে—এ রকম নির্দেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কি না। আমরা মনে করি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানুষকে ঘরে বসে থাকার নির্দেশ দেওয়া নয়, মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও উৎসব পালনের সুযোগ খর্ব না করেই তাদের নিরাপত্তাবিধান করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। পুলিশি বাধানিষেধের যে ধারা শুরু হয়েছে, তার অবসান ঘটানো উচিত। কারণ, এ রকম বাধানিষেধ থাকলে বর্ষবরণের উৎসব স্বতঃস্ফূর্ততা হারাতে পারে।

আসুন, আমরা নির্বিঘ্ন-নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশে ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে বরণ করি। নতুন বছর সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক। প্রীতি-ভালোবাসায় আনন্দ-উৎসবে দূর হয়ে যাক সব অশান্তি। পৃথিবী শান্তিময় হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here